Wednesday, June 17, 2026

ওরে ও পাতি-নেতার দল

 কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট,কাপাসিয়া,গাজীপুর

*************************************

ওরে পাতি-নেতার দল!
চামচা-বেষ্টিত ভণ্ড-ভীতুর দল!
তোদের রক্ত-চোখা ওই চশমা-আড়ালে পশুর হিংস্র চোখ,
তোদের দাপটে কেঁদে মরে আজি বাংলার লক্ষ ভীরু লোক!
চাটুকারদের ওই জয়ধ্বনি,
গলির মোড়ে মোড়ে আড্ডা-হুল্লোড়,
ওরে মনে রাখিসভাঙবে এবার তোদের পাপের ঘোর!

ওরে শোন তোরা জোচ্চোরের দল!
আর চলবে না তোদের ওই মিথ্যে ছলাকলা, ছল!
গরিবের রক্ত চুষে,
খেটে-খাওয়া মানুষের পেটে মেরে লাথি,
বড় সাহেব সেজেছিস তোরা,
ওরে ডাকাত-লুটেরা পাতি নেতার জাতি
চাঁদাবাজি আর টেন্ডার-চুরির সিন্ডিকেট-কারবার,
লাথি মেরে তোদের ক্ষমতার তখত করব চুরমার!

ওরে ও ক্ষুদ্র কীট!
ওরে ও ভীরুর দল!
রাজপথে আজ নামবে দামাল তরুণের রক্তের ঢল।
তোদের দেখে আজ থুতু ফেলে থু থুবাংলার আপামর জনতা,
ছেঁড়া জুতো খাবে তোদের ওই কুৎসিত, ভণ্ড আভিজাত্যতা!
জনতার হাতুড়ি আর কৃষাণের কাস্তে এবার গর্জে উঠেছে,
পাতি-নেতাদের মিথ্যে অহংকার যাবে এবার যমঘরে!

ওরে ও কই তোরা সর্বহারা?
ওই ও কই তোরা বিপ্লবী ছাত্র জনতা ?
জাগো আজ রুদ্র-ভৈরব বেশে,
বিপ্লবের সেই অগ্নি-বিষাণ বাজিয়ে দাও এই ত্রস্ত দেশে!
ভাঙো ভাঙো ওই ক্ষমতার ওই পাতি-কারাগার,
বিপ্লবের মহা-ঝড়ে ধুয়ে যাক তোদের শোষণের ব্যভিচার!

-----------------------------------

সেই প্রেমকে ফিরিয়ে দাও

কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট,কাপাসিয়া,গাজীপুর

***********************************************

প্রেমসে তো কোনো এক নীরব আকাশের অনন্ত নক্ষত্র,
যার আলো কথা বলে না, শুধু অনুভবে জেগে থাকে;
হৃদয় হতে হৃদয়ে তার অদৃশ্য সেতুবন্ধন
সময়ের সমস্ত কোলাহল পেরিয়ে যায় নিঃশব্দে।

একদিন প্রেম ছিল ধানক্ষেতের শেষে হারানো বিকেলের মতো,
নদীর জলে ভেসে থাকা চাঁদের কাঁপা প্রতিচ্ছবি,
শিউলি-ঝরা ভোরের মতো শান্ত, ধীর, গভীর
যেখানে অপেক্ষাই ছিল ভালোবাসার প্রথম ভাষা।

সেই প্রেম ছিল চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝা কথা,
একটি দীর্ঘ নীরবতায় গড়ে ওঠা আস্থা,
যেখানে শরীরের আগে জন্ম নিত শ্রদ্ধা,
আর স্পর্শের আগে বাঁচত বিশ্বাস।

কিন্তু আজ
এই ডিজিটাল আলো-অন্ধকারের ভিড়ে
প্রেম যেন হারিয়ে যাচ্ছে নিজেরই ছায়ায়।

স্ক্রিনের ভেতর সম্পর্ক জন্ম নেয় অতি দ্রুত,
বার্তায় হৃদয় খুলে যায় সহজে,
আর এক নিমেষেই ভেঙে যায় অদৃশ্য সেতু
যেন কিছুই ছিল না কখনো।

অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়
সবখানে আজ সম্পর্কের ভিড়,
কিন্তু কোথায় সেই শ্রদ্ধার নীরব দীপ্তি?
কোথায় সেই সংযমের মাটির গন্ধ?

প্রেমের নামে কোথাও কোথাও
নগ্নতা ঢেকে ফেলে অনুভবকে,
অবাধ মেলামেশা হারিয়ে দেয় সীমারেখা,
আর দ্রুততার তাড়নায়
ভেঙে পড়ে দায়িত্বের নরম দেয়াল।

কোথাও লিভ-টুগেদারের দ্রুততা,
কোথাও হোটেলের অন্ধকারে ক্ষণিকের আবেগ,
কোথাও ভাঙা সংসারের নিঃশব্দ কান্না
সব মিলিয়ে প্রেম যেন
নিজের অর্থ হারানো এক ক্লান্ত শব্দ।

আত্মহত্যার মতো অন্ধকার সিদ্ধান্ত,
বিশ্বাসভাঙার কাঁচের শব্দ,
সম্পর্কের ভেতর জমে থাকা এক নিঃসঙ্গ শূন্যতা
সবই যেন প্রশ্ন করে:
প্রেম কি তবে এমনই হওয়ার কথা ছিল?

তবু প্রেম পুরোপুরি মরে না
সে এখনো বেঁচে থাকে
একজন মায়ের নিঃশব্দ অপেক্ষায়,
একজন পিতার ক্লান্ত দায়িত্বে,
কিংবা কোনো অচেনা মানুষের করুণ দৃষ্টিতে।

তাই আজও কোথাও,
কোনো এক সন্ধ্যার শেষ আলোয়,
একটি শুদ্ধ ভালোবাসা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে
যেখানে এখনো শ্রদ্ধা মানে জীবন,
আর ভালোবাসা মানে দায়িত্ব।

হে সময়,
সেই প্রেমকে ফিরিয়ে দাও
যেখানে হৃদয় ছিল পবিত্র নদী,
যেখানে সম্পর্ক ছিল আকাশের মতো স্বচ্ছ,
আর মানুষ মানুষকে হারিয়ে ফেলত না
এই ঝলমলে অন্ধকারে।

--------------------------

Tuesday, June 16, 2026

ডাঃ মোহাম্মদ সানাউল্লাহ

 সম্মানিত ভাই ও বোনেরা

মানুষের জীবন কখনো কখনো প্রদীপের মতো—নিজে জ্বলে, চারপাশকে আলোকিত করে। আবার কখনো সে হয় বটবৃক্ষের মতো—নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অসংখ্য মানুষকে ছায়া দেয়। তেমনই এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন কাপাসিয়ার কৃতিসন্তান, চিকিৎসক, সমাজসেবক ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সানাউল্লাহ

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার খিরাটী গ্রামের পবিত্র মাটিতে তাঁর জন্ম। সেই গ্রামের মেঠোপথ, সবুজ ধানক্ষেত আর জনপদের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ তাঁর হৃদয়ে গেঁথে ছিল আজীবন। চিকিৎসক হিসেবে তিনি ছিলেন মানবসেবার এক নিবেদিত সৈনিক। রোগীর কষ্ট দেখলে তাঁর হৃদয় কেঁদে উঠত; যেন একজন চিকিৎসক নন, একজন অভিভাবক পাশে দাঁড়িয়েছেন বিপন্ন মানুষের।

রাজনীতির অঙ্গনেও তিনি ছিলেন এক পরিচিত নাম। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন ঢাকা-২২, বর্তমান গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসন থেকে জনগণের বিপুল সমর্থনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জনগণের ভালোবাসা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি, আর মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূলমন্ত্র।

তিনি বিশ্বাস করতেন—ক্ষমতা কোনো অলংকার নয়, এটি মানুষের সেবা করার একটি দায়িত্ব। তাই তিনি সংসদ সদস্যের আসনকে ব্যক্তিগত গৌরবের মঞ্চ নয়, বরং জনকল্যাণের কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর কর্মময় জীবন ছিল নদীর মতো—নিরবচ্ছিন্ন, গতিশীল এবং মানুষের উপকারে নিবেদিত।

জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি শরীরের ব্যথা সারিয়েছেন, আর একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন এমন এক দীপশিখা, যার আলো আজও স্মৃতির আকাশে জ্বলজ্বল করে।

২০১৭ সালের ২৫ জুন, ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু মহৎ মানুষের মৃত্যু হয় না; তাঁরা বেঁচে থাকেন কর্মে, আদর্শে এবং মানুষের হৃদয়ের গভীরে। তাঁর প্রস্থান ছিল সূর্যাস্তের মতো—দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া, কিন্তু আলো রেখে যাওয়া।

আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই জননেতা, চিকিৎসক ও মানবপ্রেমী ব্যক্তিত্বকে। তাঁর কর্ম, তাঁর সততা এবং মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকুক অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল বাতিঘর।

মোহাম্মদ সানাউল্লাহকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতি অম্লান হোক, তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকুক বাংলাদেশের ইতিহাসে।

ধন্যবাদ।

ফকির সাহাবুদ্দীন আহমদ

 সম্মানিত ভাই ও বোনেরা

আজ আমি আপনাদের সামনে এমন এক ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরছি—যিনি ইতিহাসের পাতায় শুধু একজন আইনজীবী বা রাজনীতিবিদ নন, বরং ভাষা, স্বাধীনতা ও সংবিধান রচনার এক নীরব কারিগর।

ফকির সাহাবুদ্দীন আহমদ—একটি নাম, একটি অধ্যায়, একটি সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

ঘাগুটিয়ার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকেই বহন করেছেন ইতিহাসের ভার। ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহ্যবাহী পরিবারে তাঁর শিকড়, আর শিক্ষার আলোয় গড়ে ওঠে তাঁর চিন্তার জগৎ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই অর্জন করেননি—তিনি অর্জন করেছিলেন ইতিহাস গড়ার সাহস।

১৯৫২ সাল। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো। ২০ ফেব্রুয়ারির সেই সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সভায় সভাপতিত্ব করেন তিনি। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি, রক্তে রাঙা সেই মিছিলে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে—যেখানে জন্ম নিয়েছিল মাতৃভাষার অধিকার।

তাঁর জীবনের আরেক অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের একজন বিশ্বস্ত প্রতিনিধি। শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, সিঙ্গাপুর—বিশ্বমঞ্চে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর। জাতিসংঘে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি দলের সদস্য সচিব হিসেবে তিনি বিশ্ব বিবেককে জাগিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য। আর সেই সংবিধানের ভিত্তিতেই তিনি হন দেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল—একটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো গঠনের অন্যতম প্রধান স্থপতি।

তাঁর জীবনে ছিল আরও বহু সম্পর্ক, বহু অধ্যায়। তিনি ছিলেন জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ-এর ঘনিষ্ঠ সহচর। ছিলেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-এর জুনিয়র সহকর্মী। আর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন-এর সহযাত্রী।

তাঁর পরিবারও ইতিহাসের অংশ—চাচা ফকির আবদুল মান্নানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, আর সেই সূত্রেই যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের বহু পরিচিত নাম।

জীবনের শেষ দিকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও তিনি হারাননি চিন্তার আলো। নীরবতায় থেকেও তিনি ছিলেন রাষ্ট্রচিন্তার এক দৃঢ় ভিত্তি।

ফকির সাহাবুদ্দীন আহমদ তাই কেবল একজন ব্যক্তি নন—তিনি একটি যুগ, একটি সংগ্রাম, একটি রাষ্ট্রের জন্মকথার অংশ।

আজ তাঁকে স্মরণ করা মানে—ভাষার অধিকার, স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং সংবিধানের ভিত্তিকে নতুন করে উপলব্ধি করা।

ধন্যবাদ।

ফকির মজনু শাহ

 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা

  ইতিহাসের আকাশে কিছু নক্ষত্র থাকে, যারা নিজেরা নিভে গেলেও যুগের পর যুগ আলো ছড়িয়ে যায় মানুষের চেতনায়। কিছু নাম থাকে, যাদের পদচিহ্ন শুধু মাটিতে নয়, খোদাই হয়ে থাকে জাতির আত্মায়। আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে এসেছি বাংলার প্রতিরোধ সংগ্রামের এক কিংবদন্তি বীর, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অগ্নিপুরুষ, ফকির মজনু শাহের জীবনগাথা।

তিনি ছিলেন সাধক, তিনি ছিলেন সংগ্রামী;
তিনি ছিলেন দরবেশ, তিনি ছিলেন দুর্বার বিদ্রোহী;
তিনি ছিলেন মানবতার আহ্বানকারী, আবার শোষকের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ প্রতিবাদী।

বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান মানুষটি ছিলেন মাদারিয়া তরিকার একজন ফকির। তরিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সৈয়দ বদিউদ্দিন কুতুবউল শাহ মাদার। কানপুরের নিকটবর্তী মাকানপুরে অবস্থিত শাহ মাদারের মাজার ছিল তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু তাঁর আত্মা সীমাবদ্ধ ছিল না কোনো খানকাহে, কোনো মাজারে কিংবা কোনো ভূখণ্ডে। তাঁর হৃদয় জুড়ে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য প্রত্যয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার পর বাংলার আকাশে যখন স্বাধীনতার সূর্য ম্লান হয়ে আসে, তখন বাংলার মাঠে-ঘাটে, নদীর তীরে, জনপদের অলিগলিতে জমতে থাকে ক্ষোভের কালো মেঘ। সেই মেঘের বুক চিরে বিদ্রোহের বজ্রধ্বনি হয়ে আবির্ভূত হন ফকির মজনু শাহ। বহু পণ্ডিতের মতে, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম দিককার অন্যতম বৃহৎ যুদ্ধ। আর সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ছিলেন এই মজনু শাহ।

১৭৬১ সালের উধুয়ানালার যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে তিনি একত্র করেছিলেন অসংখ্য মুসলিম ফকির হিন্দু সন্ন্যাসীকে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল ঐক্যের আহ্বান। তিনি বুঝেছিলেনপরাধীনতার শিকল ধর্ম দেখে বাঁধে না, তাই মুক্তির সংগ্রামও ধর্মের বিভাজন মানতে পারে না। তাঁর পতাকার নিচে মিলেছিল মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি; মিলেছিল ফকিরের জিকির আর সন্ন্যাসীর ধ্যান।

১৭৭১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরে লেফটেন্যান্ট ফেলথামের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ সিপাহীদের সঙ্গে তাঁর প্রথম বড় সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের ফল তাঁর অনুকূলে না এলেও তিনি থেমে যাননি। কারণ পরাজয় ছিল তাঁর কাছে নতুন জাগরণের আরেকটি নাম। সেই সংঘর্ষের পর তিনি চলে যান বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের খানকায়। সেখানেই তিনি আবার সংগঠিত করেন তাঁর সংগ্রামী বাহিনী।

১৭৭৩ সালের শীত নামলে রংপুর রাজশাহীর জনপদে আবার দেখা যায় তাঁর পদচারণা। তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় সন্ন্যাসীদের একটি শক্তিশালী দল। বাংলার মাটিতে আবারও জেগে ওঠে প্রতিরোধের আগুন। ১৭৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চারটি সিপাহী কোম্পানির সঙ্গে সংঘটিত হয় তুমুল যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনী আক্রমণ প্রতিহত করলেও মজনু শাহের বিদ্রোহী চেতনা দমন করতে পারেনি।

দিনাজপুর, রংপুর এবং বগুড়া হয়ে ওঠে তাঁর সংগ্রামের দুর্গ। তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার বাণী। তিনি শিখিয়েছিলেনস্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার; ধর্ম মানুষের বিবেকের আলো; আর ঐক্য হলো বিজয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।

তাঁর পরিচয় নিয়েও ইতিহাসে রয়েছে নানা মত। তাঁর অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ হায়দার আলী চৌধুরীর মতে, ফকির মজনু শাহের প্রকৃত নাম ছিল নূর উদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং। তিনি ছিলেন মুঘল বংশীয় এক শাহজাদা। আরও বলা হয়, তাঁর কন্যা লালবিবি ছিলেন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ বাহাদুর শাহের জননী। ইতিহাসের পাতা বিষয়ে নানা মতামতে বিভক্ত হলেও, তাঁর বীরত্ব নেতৃত্ব নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।

আরেকটি সূত্র জানায়, ১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি প্রায় পাঁচশত সৈন্য নিয়ে বগুড়া থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পথে কালেশ্বর নামক স্থানে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে তাঁর এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে নিয়ে রাজশাহী মালদহ অতিক্রম করে বিহারের সীমান্ত অঞ্চলে পৌঁছে। অবশেষে মাখনপুর নামক এক পল্লিতে থেমে যায় তাঁর সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘ যাত্রা। ১৭৮৭ সালে নিভে যায় এক বিদ্রোহী প্রদীপ, কিন্তু জ্বলে ওঠে হাজারো নতুন শিখা।

মৃত্যুর পরও তাঁর আন্দোলন থেমে থাকেনি। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মুশা শাহ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মাস্কেট রকেটের সাহায্যে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। অবশেষে ১৭৯২ সালের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনিও শহীদ হন। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলার প্রতিরোধ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।

ফকির মজনু শাহ ছিলেন না কেবল একজন বিদ্রোহী নেতা। তিনি ছিলেন এক দর্শন, এক চেতনা, এক অনির্বাণ শিখা। তিনি শিখিয়েছেনঅত্যাচার যত শক্তিশালী হোক, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও শক্তিশালী। তিনি দেখিয়েছেনঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তির কাছে সাম্রাজ্যবাদও একদিন পরাজিত হয়।

প্রিয় দর্শকবৃন্দ,

ফকির মজনু শাহ আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের পদধ্বনি এখনও শোনা যায় বাংলার মাঠে, নদীর ঢেউয়ে, ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়। তিনি আমাদের শেখানস্বাধীনতার জন্য ত্যাগ করতে হয়, ন্যায়ের জন্য লড়তে হয়, আর মানুষের কল্যাণের জন্য ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে হয়।

আসুন, এই মহান বীরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা উচ্চারণ করি

যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন মজনু শাহের চেতনা বেঁচে থাকবে।
যতদিন স্বাধীনতার স্বপ্ন থাকবে, ততদিন বাংলার আকাশে জ্বলবে তাঁর নাম।

ধন্যবাদ।
আল্লাহ হাফেজ।

--------------------------------------------------------