Tuesday, June 16, 2026

ফকির মজনু শাহ

 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা

  ইতিহাসের আকাশে কিছু নক্ষত্র থাকে, যারা নিজেরা নিভে গেলেও যুগের পর যুগ আলো ছড়িয়ে যায় মানুষের চেতনায়। কিছু নাম থাকে, যাদের পদচিহ্ন শুধু মাটিতে নয়, খোদাই হয়ে থাকে জাতির আত্মায়। আজ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে এসেছি বাংলার প্রতিরোধ সংগ্রামের এক কিংবদন্তি বীর, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের অগ্নিপুরুষ, ফকির মজনু শাহের জীবনগাথা।

তিনি ছিলেন সাধক, তিনি ছিলেন সংগ্রামী;
তিনি ছিলেন দরবেশ, তিনি ছিলেন দুর্বার বিদ্রোহী;
তিনি ছিলেন মানবতার আহ্বানকারী, আবার শোষকের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ প্রতিবাদী।

বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান মানুষটি ছিলেন মাদারিয়া তরিকার একজন ফকির। তরিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সৈয়দ বদিউদ্দিন কুতুবউল শাহ মাদার। কানপুরের নিকটবর্তী মাকানপুরে অবস্থিত শাহ মাদারের মাজার ছিল তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু তাঁর আত্মা সীমাবদ্ধ ছিল না কোনো খানকাহে, কোনো মাজারে কিংবা কোনো ভূখণ্ডে। তাঁর হৃদয় জুড়ে ছিল মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য প্রত্যয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতার পর বাংলার আকাশে যখন স্বাধীনতার সূর্য ম্লান হয়ে আসে, তখন বাংলার মাঠে-ঘাটে, নদীর তীরে, জনপদের অলিগলিতে জমতে থাকে ক্ষোভের কালো মেঘ। সেই মেঘের বুক চিরে বিদ্রোহের বজ্রধ্বনি হয়ে আবির্ভূত হন ফকির মজনু শাহ। বহু পণ্ডিতের মতে, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম দিককার অন্যতম বৃহৎ যুদ্ধ। আর সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ছিলেন এই মজনু শাহ।

১৭৬১ সালের উধুয়ানালার যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে তিনি একত্র করেছিলেন অসংখ্য মুসলিম ফকির হিন্দু সন্ন্যাসীকে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল ঐক্যের আহ্বান। তিনি বুঝেছিলেনপরাধীনতার শিকল ধর্ম দেখে বাঁধে না, তাই মুক্তির সংগ্রামও ধর্মের বিভাজন মানতে পারে না। তাঁর পতাকার নিচে মিলেছিল মসজিদের আজান আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি; মিলেছিল ফকিরের জিকির আর সন্ন্যাসীর ধ্যান।

১৭৭১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরে লেফটেন্যান্ট ফেলথামের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ সিপাহীদের সঙ্গে তাঁর প্রথম বড় সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের ফল তাঁর অনুকূলে না এলেও তিনি থেমে যাননি। কারণ পরাজয় ছিল তাঁর কাছে নতুন জাগরণের আরেকটি নাম। সেই সংঘর্ষের পর তিনি চলে যান বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের খানকায়। সেখানেই তিনি আবার সংগঠিত করেন তাঁর সংগ্রামী বাহিনী।

১৭৭৩ সালের শীত নামলে রংপুর রাজশাহীর জনপদে আবার দেখা যায় তাঁর পদচারণা। তাঁর সঙ্গে যোগ দেয় সন্ন্যাসীদের একটি শক্তিশালী দল। বাংলার মাটিতে আবারও জেগে ওঠে প্রতিরোধের আগুন। ১৭৭৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চারটি সিপাহী কোম্পানির সঙ্গে সংঘটিত হয় তুমুল যুদ্ধ। ইংরেজ বাহিনী আক্রমণ প্রতিহত করলেও মজনু শাহের বিদ্রোহী চেতনা দমন করতে পারেনি।

দিনাজপুর, রংপুর এবং বগুড়া হয়ে ওঠে তাঁর সংগ্রামের দুর্গ। তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার বাণী। তিনি শিখিয়েছিলেনস্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার; ধর্ম মানুষের বিবেকের আলো; আর ঐক্য হলো বিজয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।

তাঁর পরিচয় নিয়েও ইতিহাসে রয়েছে নানা মত। তাঁর অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ হায়দার আলী চৌধুরীর মতে, ফকির মজনু শাহের প্রকৃত নাম ছিল নূর উদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং। তিনি ছিলেন মুঘল বংশীয় এক শাহজাদা। আরও বলা হয়, তাঁর কন্যা লালবিবি ছিলেন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ বাহাদুর শাহের জননী। ইতিহাসের পাতা বিষয়ে নানা মতামতে বিভক্ত হলেও, তাঁর বীরত্ব নেতৃত্ব নিয়ে কোনো মতভেদ নেই।

আরেকটি সূত্র জানায়, ১৭৮৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি প্রায় পাঁচশত সৈন্য নিয়ে বগুড়া থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। পথে কালেশ্বর নামক স্থানে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে তাঁর এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর অনুগামীরা তাঁকে নিয়ে রাজশাহী মালদহ অতিক্রম করে বিহারের সীমান্ত অঞ্চলে পৌঁছে। অবশেষে মাখনপুর নামক এক পল্লিতে থেমে যায় তাঁর সংগ্রামী জীবনের দীর্ঘ যাত্রা। ১৭৮৭ সালে নিভে যায় এক বিদ্রোহী প্রদীপ, কিন্তু জ্বলে ওঠে হাজারো নতুন শিখা।

মৃত্যুর পরও তাঁর আন্দোলন থেমে থাকেনি। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র মুশা শাহ নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মাস্কেট রকেটের সাহায্যে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। অবশেষে ১৭৯২ সালের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনিও শহীদ হন। কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ বাংলার প্রতিরোধ ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।

ফকির মজনু শাহ ছিলেন না কেবল একজন বিদ্রোহী নেতা। তিনি ছিলেন এক দর্শন, এক চেতনা, এক অনির্বাণ শিখা। তিনি শিখিয়েছেনঅত্যাচার যত শক্তিশালী হোক, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার চেয়েও শক্তিশালী। তিনি দেখিয়েছেনঐক্যবদ্ধ মানুষের শক্তির কাছে সাম্রাজ্যবাদও একদিন পরাজিত হয়।

প্রিয় দর্শকবৃন্দ,

ফকির মজনু শাহ আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের পদধ্বনি এখনও শোনা যায় বাংলার মাঠে, নদীর ঢেউয়ে, ইতিহাসের প্রতিটি পাতায়। তিনি আমাদের শেখানস্বাধীনতার জন্য ত্যাগ করতে হয়, ন্যায়ের জন্য লড়তে হয়, আর মানুষের কল্যাণের জন্য ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়াতে হয়।

আসুন, এই মহান বীরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা উচ্চারণ করি

যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন মজনু শাহের চেতনা বেঁচে থাকবে।
যতদিন স্বাধীনতার স্বপ্ন থাকবে, ততদিন বাংলার আকাশে জ্বলবে তাঁর নাম।

ধন্যবাদ।
আল্লাহ হাফেজ।

--------------------------------------------------------

 

No comments:

Post a Comment