Wednesday, June 24, 2026

তিনি এখন বৃদ্ধাশ্রমে

 কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট,কাপাসিয়া,গাজীপুর

************************************

 

তিনি ছিলেন একদিন সুনামধন্য চিকিৎসক,
মানুষের ব্যথার নিঃশব্দ দেবদূত,
শহরের ধুলো-রাস্তায় তাঁর নাম মানেই ছিল আশার আলো,
গরিবের ঘরে তিনি ছিলেন জীবন্ত প্রার্থনা।

চার সন্তান তাঁর
দুই পুত্র, দুই কন্যা;
মেধার দীপ জ্বেলে তারা এগিয়েছে দূর আকাশে,
কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার, কেউ অধ্যাপক, কেউ ব্যারিস্টার
শিক্ষার জ্যোতিতে উজ্জ্বল একেকটি তারা।

বাবা গড়ে তুলেছিলেন তাদের
স্নেহের অরণ্যে,
মমতার নদী বেয়ে বেয়ে
নিজের ক্লান্ত জীবনকে বিসর্জন দিয়ে।

কিন্তু সময়
সে তো নির্দয় ঋতুর মতো,
একদিন সব ফুল ঝরিয়ে দেয় নিঃশব্দ ঝড়ে।

শরীরের দীপ্তি হারাল তিনি,
হাড়ে হাড়ে জমল ক্লান্তির শীত,
উপার্জনের নদী শুকিয়ে গেল বালুচরে।

তখনই এলো তারা
চোখে কৃত্রিম হাসির কুয়াশা,
কণ্ঠে মায়ার নকল সুর,
বললো
বাবা, ব্যাংকের টাকা দাও, আমরা বিদেশে যাবো।

বিশ্বাস ছিল তাঁর চোখে
বসন্তের প্রথম কোকিল ডাকার মতো কোমল,
অজান্তেই সই করে দিলেন চেকে
নিজের জীবনের শেষ সঞ্চয়।

তারপর নীরব ঝড় নেমে এলো
ছেলে-মেয়েরা পাড়ি দিলো দূর সমুদ্রের ওপারে,
আর বাবা রয়ে গেলেন
একাকীত্বের ধূসর আকাশে হারিয়ে যাওয়া মেঘ হয়ে।

দিন যায়, রাত নামে,
কেউ খোঁজ নেয় না
যেন তিনি কোনো ভুলে যাওয়া কবিতা,
যার শেষ লাইন কেউ আর পড়ে না।

একদিন সময় তাঁর শরীরে ভেঙে পড়লো
স্ট্রোকের বজ্রাঘাতে থেমে গেল অর্ধেক জীবন,
হাত-পা যেন নদীর ভাঙা বাঁধ,
অচল, নিঃশব্দ, নিঃসহায়।

এখন তিনি বৃদ্ধাশ্রমে
একটি জানালার পাশে বসে থাকেন
শুকনো পাতার মতো কাঁপা শরীরে,
বাইরে আকাশ কাঁদে বর্ষার মেঘ হয়ে,
আর ভিতরে তিনি কাঁদেন নিঃশব্দে।

চোখের জল তাঁর
নদীর মতো থেমে নেই
একেকটি অশ্রু যেন
অভিমানী বর্ষার প্রথম বৃষ্টি,
যা মাটিকে নয়, হৃদয়কে ভিজিয়ে দেয়।

তিনি ভাবেন
এই কি সেই সন্তান,
যাদের জন্য নিজের ঘুম বিক্রি করেছিলেন?
যাদের হাতে স্বপ্ন তুলে দিয়েছিলেন সূর্যের মতো?

বৃদ্ধাশ্রমের নিঃসঙ্গ বাতাস
তাঁর কানের পাশে ফিসফিস করে বলে
তুমি বাবা, তবু আজ পরিত্যক্ত বৃক্ষ।

তবু আশ্চর্য
কোনো অভিশাপ নেই তাঁর ঠোঁটে,
নেই কোনো ক্রোধের আগুন,
শুধু এক অগাধ শূন্যতা
যেখানে ভালোবাসা এখনো রক্তের মতো বইছে।

তিনি শুধু আকাশের দিকে তাকান
যেন সেখানে কোথাও
সন্তানের মুখ ভেসে ওঠে মেঘের ভাঁজে।

আর প্রতিটি সূর্যাস্তে
বৃদ্ধাশ্রমের উঠোনে পড়ে থাকা ছায়ার মতো
একজন বাবা
নিজেরই ভাঙা জীবনকে
নীরবে জড়িয়ে ধরে কাঁদেন।

বৃদ্ধাশ্রমের সেই নিঃসঙ্গ বিকেলে
একজন বাবা আজও বেঁচে আছেন
শরীরে নয়, কেবল ভালোবাসার অবশিষ্ট শ্বাসে,
আর এক অসমাপ্ত কষ্টের কবিতায়।

----------------------------------------------------------------

No comments:

Post a Comment