বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সম্মানিত ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
বাংলার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি জনপদের নয়, বরং একটি জাতির সম্পদ হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন সংগ্রাম, সাহস, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখায়। আজ আমরা স্মরণ করছি এমনই এক কৃতী সন্তানকে—কাপাসিয়ার গর্ব, গাজীপুরের অহংকার, বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বীর সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহকে।
১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর, গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঘাগটিয়া ইউনিয়নের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্ম থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন এক গৌরবময় রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐতিহ্যের পরিবারে। তাঁর পিতা ফকির আবদুল মান্নান শাহ ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, পাকিস্তান সরকারের কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী এবং মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতা। তাঁর ভাই শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
শিক্ষাজীবনে হান্নান শাহ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও শৃঙ্খলাপরায়ণ। ১৯৫৬ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার প্রত্যয়ে বেছে নেন সামরিক জীবন।
১৯৬২ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু ইতিহাসের এক কঠিন সময়ে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অন্যান্য বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের মতো তাকেও পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছিল। স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
দেশপ্রেম, কর্তব্যনিষ্ঠা ও নেতৃত্বগুণের কারণে তিনি সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু কর্মবীরের জীবনে অবসর বলে কিছু থাকে না। তিনি দায়িত্ব নেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন—বিএডিসির চেয়ারম্যান হিসেবে। কৃষি উন্নয়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতায় তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন একজন সফল সংগঠক হিসেবে।
তবে তাঁর হৃদয়ের টান ছিল জনগণের মাঝে, দেশের রাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে। তাই ১৯৮৩ সালে তিনি বিএডিসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে যোগদান করেন।
সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা। তিনি ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক সম্পাদক (ঢাকা বিভাগ) হিসেবে সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করেন। ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-৪, তথা কাপাসিয়ার জনগণ তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে। জনগণের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতিদান দিতে তিনি একই বছরে বাংলাদেশের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন মন্ত্রী হিসেবে যেমন তিনি রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করেছেন, তেমনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের বিশ্বস্ত সাথী।
দলের প্রতি নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি অবিচলতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম—জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলেও তাঁর এই পদ বহাল রাখা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিভাবক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠস্বর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী ও দায়িত্বশীল পিতা। তাঁর সহধর্মিণী নাহিদ হান্নান ছিলেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার নীরব শক্তি। তাঁদের একমাত্র কন্যা শারমিন হান্নান সুমি এবং দুই পুত্র শাহ রেজাউল হান্নান ও শাহ রিয়াজুল হান্নান আজও বহন করছেন তাঁর আদর্শ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের দীপ্ত উত্তরাধিকার।
জীবনের দীর্ঘ কর্মময় পথচলার অবসান ঘটে ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের র্যাফেলস হার্ট সেন্টারে অবস্থানকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।
কিন্তু কিছু মানুষ মৃত্যুর মধ্য দিয়েও হারিয়ে যান না। তাঁদের কর্ম, তাঁদের আদর্শ, তাঁদের ত্যাগ এবং তাঁদের অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরদিন বেঁচে থাকে। আ স ম হান্নান শাহ তেমনই এক নাম।
তিনি ছিলেন সৈনিকের সাহস, রাজনীতিকের প্রজ্ঞা, নেতার দূরদর্শিতা এবং দেশপ্রেমিকের অঙ্গীকারের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি ছিলেন কাপাসিয়ার মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক, জাতীয় রাজনীতির এক সুপরিচিত মুখ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর।
আজ তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাঁর কর্মময় জীবনকে। তাঁর অবদান, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর দেশপ্রেম আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।
আল্লাহ তাআলা মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন।
আমিন।
আমি তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এখানেই শেষ করছি আজকের আয়োজন।
সবাইকে ধন্যবাদ।
ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
-------------------------------------------------
No comments:
Post a Comment