Monday, June 15, 2026

বঙ্গতাজ তাজউদ্দিন আহম্মেদ

 

কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট,কাপাসিয়া,গাজীপুর

********************************************************

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা

আসছালামু আলাইকুম।

বাংলার আকাশে যখনই স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য উদিত হয়, যখনই লাল-সবুজের পতাকা বাতাসে দোলে, যখনই বিজয়ের গান ধ্বনিত হয় বাংলার জনপদেতখন ইতিহাসের গভীর থেকে ভেসে আসে এক মহান নাম, এক অবিনাশী প্রেরণা, এক অনির্বাণ আলোকশিখাশহীদ তাজউদ্দীন আহমদ।

তিনি ছিলেন না কেবল একজন রাজনীতিবিদ,
তিনি ছিলেন ইতিহাসের সংকটকালে জাতির প্রজ্ঞা,
ঝড়ের রাতে বাতিঘর,
অন্ধকারে জ্বলে ওঠা প্রদীপ,
স্বাধীনতার মহাকাব্যের এক নীরব অথচ মহিমান্বিত নায়ক।

১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই, কাপাসিয়ার দরদরিয়ার সবুজ শ্যামল প্রকৃতির কোলে জন্ম নিয়েছিল এক শিশু। কে জানত, সেই শিশুই একদিন কোটি মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড় করাবেন! গ্রামের মেঠোপথ, শস্যখেত, নদীর কলতান আর পাখির গানে বেড়ে ওঠা সেই বালক পরিণত হয়েছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে।

জ্ঞান ছিল তাঁর অলংকার,
সততা ছিল তাঁর শক্তি,
দেশপ্রেম ছিল তাঁর সাধনা,
আর জনগণ ছিল তাঁর প্রার্থনার মর্মবাণী।

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে তিনি ছিলেন সংগ্রামের সহযাত্রী। কারাগারের শৃঙ্খল তাঁকে থামাতে পারেনি, নির্যাতন তাঁকে ভীত করতে পারেনি, অন্যায়ের সামনে তিনি কখনো মাথা নত করেননি।

তারপর এলো ১৯৭১।

বাংলার আকাশে বারুদের গন্ধ,
মাটিতে রক্তের স্রোত,
চারদিকে আগুন, কান্না আর মৃত্যুর বিভীষিকা।

২৫ মার্চের সেই কালরাত্রি
যখন হানাদার বাহিনীর বুটের নিচে কেঁপে উঠছিল বাংলাদেশ,
যখন বঙ্গবন্ধু বন্দী,
যখন দিগন্তজুড়ে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ,
ঠিক তখনই ইতিহাসের মঞ্চে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

তিনি বুঝেছিলেন,
একটি যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে জেতা যায় না;
জেতা যায় প্রজ্ঞা দিয়ে,
জেতা যায় সংগঠন দিয়ে,
জেতা যায় দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে।

তাই তিনি গড়ে তুললেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার
মুজিবনগর সরকার।

যে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে ছিল স্বাধীনতার শপথ,
যে সরকারের প্রতিটি নিশ্বাসে ছিল বিজয়ের প্রত্যয়,
যে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল মুক্ত বাংলার স্বপ্ন।

তিনি ছিলেন সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী,
কিন্তু পদবীর চেয়ে বড় ছিল তাঁর দায়িত্ব।
তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক সেনাপতি,
স্বাধীনতার কূটনৈতিক দূত,
মুক্তির সংগ্রামের অবিচল অধিনায়ক।

যখন সীমান্তের ওপারে শরণার্থীদের দীর্ঘশ্বাস,
যখন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্রের অভাব,
যখন বিশ্বের বহু শক্তিধর রাষ্ট্র নীরব,
তখন তিনি একাই যেন একটি জাতির আশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

তাঁর দৃঢ়তা ছিল পাহাড়সম,
তাঁর ধৈর্য ছিল সমুদ্রসম,
তাঁর দেশপ্রেম ছিল আকাশের মতো অসীম।

অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।

বাংলার আকাশে উড়ল স্বাধীনতার পতাকা।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে জন্ম নিল বাংলাদেশ।

সেই বিজয়ের পেছনে অগণিত শহীদের রক্ত যেমন রয়েছে,
তেমনি রয়েছে তাজউদ্দীন আহমদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, অক্লান্ত শ্রম অবিস্মরণীয় অবদান।

স্বাধীনতার পরও তিনি থামেননি।
ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।
অর্থনীতির ভিত নির্মাণে, উন্নয়নের পথরেখা আঁকতে, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে তিনি ছিলেন এক নিরলস কর্মযোদ্ধা।

কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা বড় নিষ্ঠুর।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর,
পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে
নিভিয়ে দেওয়া হয় এই মহৎ প্রাণের প্রদীপ।

ভাবা হয়েছিল
একজন মানুষকে হত্যা করলে তাঁর আদর্শও মুছে যাবে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী,
রক্ত ঝরে,
মানুষ মরে,
কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয় না।

আজও তাজউদ্দীন আহমদ বেঁচে আছেন
স্বাধীনতার প্রতিটি গল্পে,
বিজয়ের প্রতিটি গানে,
বাংলার প্রতিটি পতাকার দোলায়,
এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্মৃতিতে।

তিনি বেঁচে আছেন কাপাসিয়ার মাটিতে,
বাংলার বাতাসে,
যুবসমাজের প্রেরণায়,
দেশপ্রেমিক হৃদয়ের স্পন্দনে।

আসুন,
আমরা এই মহান নেতার স্মৃতির সামনে মাথা নত করি।
তাঁর সততা থেকে শিক্ষা নিই,
তাঁর দেশপ্রেমকে ধারণ করি,
তাঁর আদর্শকে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিই।

কারণ জাতির ইতিহাসে কিছু মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করেন।
তারা হয়ে ওঠেন যুগের পর যুগের পথপ্রদর্শক।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ তেমনই এক মহামানব
বাংলার স্বাধীনতার মহাকাব্যের এক অবিনশ্বর অধ্যায়,
এক অমর নাম,
এক চিরন্তন প্রেরণা।

তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

----------------------------------------------------------

No comments:

Post a Comment