Sunday, June 14, 2026

ফকির আবদুল মান্নান শাহ

 কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট,কাপাসিয়া,গাজীপুর

***************************************

সম্মানিত উপস্থিত সুধীবৃন্দ,

কিছু মানুষ জন্ম নেন সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করার জন্য। কিছু মানুষ নিজ জীবনকে এমনভাবে ইতিহাসের সঙ্গে মিশিয়ে দেন যে, তাঁদের নাম উচ্চারিত হলে একটি যুগ, একটি আন্দোলন, একটি জনপদের গৌরব আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তেমনি এক বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন ফকির আবদুল মান্নান শাহরাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, জননেতা, পাকিস্তানের কৃষি খাদ্যমন্ত্রী, তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক পরবর্তীকালে সভাপতি।

১৯০১ সালের জানুয়ারি, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ঘাগটিয়া গ্রামের নিভৃত পল্লীতে তাঁর জন্ম। পিতা ফকির আব্দুল ওয়াহাব এবং মাতা মোছাম্মৎ রুছমুতেন নেছার স্নেহধন্য এই সন্তান শৈশবেই জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হওয়ার সংকল্প করেছিলেন। গ্রামের মাদ্রাসার মাটির ঘরে শুরু হওয়া সেই শিক্ষাযাত্রা ধাপে ধাপে তাঁকে নিয়ে যায় উচ্চশিক্ষার শিখরে। ১৯২৫ সালে মেট্রিকুলেশন, ১৯২৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯২৯ সালে স্নাতক এবং ১৯৩৪ সালে আইন ডিগ্রি (বিএল) অর্জন করে তিনি প্রমাণ করেনপ্রতিভা অধ্যবসায়ের কাছে সকল প্রতিকূলতা পরাজিত।

কর্মজীবনের প্রথম অধ্যায় শিক্ষকতা। জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে মানুষ গড়ার মহৎ দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রবেশ করেন আইনাঙ্গনে। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার আলীপুর জজ কোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। পরের বছর ঢাকা জজকোর্টে যোগদান করেন এবং ১৯৫১ সালে ঢাকা হাইকোর্টের এডভোকেট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। মৃত্যুর পূর্বদিন পর্যন্ত, দীর্ঘ কয়েক দশক, তিনি ন্যায়বিচারের পতাকা হাতে আইন পেশায় অবিচল ছিলেন।

তাঁর বিচক্ষণতা নেতৃত্ব তাঁকে কেবল আদালতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তিনি ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সমিতির সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা সিন্ডিকেট সদস্য এবং ঢাকা জেলা কারাগার পরিদর্শন কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সমাজ রাষ্ট্রের কল্যাণ ছিল তাঁর কর্মের মূলমন্ত্র।

রাজনীতির অঙ্গনে তাঁর পদচারণা শুরু হয় ১৯৩৬ সালে কৃষক প্রজা পার্টির সদস্যপদ গ্রহণের মাধ্যমে। কৃষকের ঘাম, মেহনতি মানুষের অধিকার এবং জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ভাবতেন গভীরভাবে। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তানের এমএলএ নির্বাচিত হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের অগ্রসৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ববাংলা আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী তাজউদ্দীন আহমদের নিকট পরাজিত হলেও জনসেবার অঙ্গীকার থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি। কারণ সত্যিকারের নেতা পরাজয়ে নয়, আদর্শে বেঁচে থাকেন।

১৯৬৫ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মন্ত্রিসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত কৃষি খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। কৃষকের মাঠ, ফসলের স্বপ্ন এবং মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর সিদ্ধান্ত কর্মপরিকল্পনা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন এক গর্বিত পিতা। তাঁর তিন পুত্র দুই কন্যা দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেন। বড় ছেলে প্রয়াত হান্নান শাহ ছিলেন সাবেক সাংসদ, পাটমন্ত্রী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক তারকা জেনারেল এবং বিএনপির বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। মেঝ ছেলে শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন। ছোট ছেলে মোবারক শাহ যুক্তরাষ্ট্রে আমেরিকান এক্সপ্রেসে কর্মরত ছিলেন।

তাঁর বড় মেয়ে আনোয়ারা ইদ্রিস ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম নির্বাচিত মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের চাচী। ছোট মেয়ে আঞ্জুমান আরা বেগম মিনু আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তাঁদের অর্জনের ভেতর দিয়েও প্রতিফলিত হয় পিতার আদর্শ, শিক্ষা দূরদর্শিতা।

অবশেষে ১৯৯৩ সালের ৩১ অক্টোবর, ঢাকার তেজগাঁওয়ের কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ের ৮৪ নম্বর বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু কিছু মৃত্যু কেবল দেহের অবসান ঘটায়, স্মৃতির নয়; কিছু বিদায় কেবল মানুষকে চোখের আড়াল করে, হৃদয়ের নয়।

আজও কাপাসিয়ার বাতাসে, ঘাগটিয়ার মাটিতে, ইতিহাসের পাতায় এবং মানুষের স্মৃতিতে তাঁর পদচিহ্ন অমলিন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের দীপশিখা, ন্যায়ের কণ্ঠস্বর, রাজনীতির প্রজ্ঞাবান পথিক এবং জনসেবার এক অনন্য প্রতীক।

তাঁর জীবন আমাদের শেখায়ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, পদ মর্যাদা নশ্বর; কিন্তু সততা, প্রজ্ঞা, কর্ম এবং মানুষের জন্য ভালোবাসা চিরকাল বেঁচে থাকে।

ফকির আবদুল মান্নান শাহ শুধু একটি নাম নন; তিনি একটি ইতিহাস, একটি সংগ্রাম, একটি উত্তরাধিকার এবং কাপাসিয়ার গর্বিত আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বলতম অধ্যায়।

-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

No comments:

Post a Comment