রবিবার, আগস্ট ২৩, ২০২৬

মিলাদুন্নবীর প্রধান শিক্ষা


কলমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা

রাওনাট, কাপাসিয়া,গাজীপুর্

***********************************************

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি ‘আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।

উপস্থিত শান্তিকামী সুধীমণ্ডলী, মানবজাতির প্রতিনিধি ভাই ও বোনেরা! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আজ এক মহিমান্বিত দিন। আজ মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহামানব, হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শুভ আগমনের দিন—‘ঈদে মিলাদুন্নবী’। ফারসি ‘ঈদ’ মানে আনন্দ এবং ‘মিলাদ’ মানে জন্ম। আজ আমি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে তাঁর আগমনের মূল ভাবধারা ও তাৎপর্য আরজ করব।

তিনি কেবল মুসলমানদের নবী নন, বরং পুরো মানবজাতির পথপ্রদর্শক। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:


"
আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।" (সূরা আল-আনবিয়া, আয়াত: ১০৭)

জগতে যত সৃষ্টি আছে, সবার জন্যই তিনি আল্লাহর এক বিশেষ ‘তোহফা’ বা উপহার। এই মহান নেয়ামত পাওয়ার পর আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন:


"
বলুন, আল্লাহর দয়া ও তাঁর রহমত পাওয়ার কারণে তাদের আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।" (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৫৮)

সমগ্র মানবজাতির জন্য তাঁর চেয়ে বড় রহমত আর কেউ নেই। তাই এই দিনে আনন্দিত হওয়া এবং তাঁর আদর্শকে স্মরণ করা পুরো মানবকুলের জন্য পরম কল্যাণকর।

আল্লাহর হাবিব যখন পৃথিবীতে তাশরিফ আনলেন, তখন গোটা পৃথিবী নিমজ্জিত ছিল ঘোর ‘জুলুমাত’ বা অন্ধকারের অতল গহ্বরে। মানুষে মানুষে কোনো সমতা ছিল না, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত সমাহিত করা হতো।

তিনি এসে এই বর্বরতার অবসান ঘটালেন। তিনি ঘোষণা করলেন—সব মানুষ সমান। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো মানুষের চরিত্র এবং ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি। ফারসি কবি শেখ সাদী সিরাজী (রহ.) নবীজির আগমনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে চমৎকার লিখেছেন:

"বা মুস্তফা বেরেসাঁ খোশ রা কেহ দ্বীন হামা ওস্ত,
আগার বাহু নারেসিদি, তামাম বুলাহাবিস্ত।"
(
অর্থাৎ: নিজেকে মোস্তফার আদর্শ পর্যন্ত পৌঁছে দাও, কারণ তাঁর আদর্শই হলো পূর্ণ দ্বীন। যদি তাঁর পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারো, তবে তোমার জীবন আবু লাহাবের মতোই অন্ধকার রয়ে গেল।)

 

আজকের এই মিলাদুন্নবীর প্রধান শিক্ষা হলো মানুষের চরিত্র উন্নত করা। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই বলেছেন, "উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।"

অমর ফারসি কবি শেখ সাদী সিরাজী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘গুলিস্তাঁ’ গ্রন্থে নবীজির চরিত্রের এই অতুলনীয় রূপ বর্ণনা করে আরও লিখেছেন:

"বলাগাল উলা বি কামালিহি, কাশাফাদ দুজা বি জামালিহি,
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি, সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।"
(
অর্থাৎ: তিনি তাঁর পূর্ণতা দ্বারা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। তাঁর সৌন্দর্যের নুরে সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে গেছে। তাঁর সব চরিত্রই সুন্দর। তাঁর ওপর এবং তাঁর পরিবারের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।)

 

তিনি মদিনা সনদের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রথম লিখিত অসাম্প্রদায়িক সংবিধান তৈরি করেন, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে যদি আমরা শান্তি ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে আমাদের বর্ণবাদ ও হিংসা ভুলে তাঁর ‘খুলুকে আজিম’ বা মহান চরিত্রের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

আজকের চারদিকে যুদ্ধ, হাহাকার এবং অস্ত্রের মহড়া। এই কঠিন সময়ে ঈদে মিলাদুন্নবী আমাদের বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের পাঠ শেখায়। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন:

"সমগ্র সৃষ্টি জগৎ আল্লাহর পরিবারস্বরূপ। অতএব, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি প্রিয়, যিনি তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়া ও পরোপকার করেন।" (বায়হাকী)

আজ যদি বিশ্বনেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষ তাঁর এই সর্বজনীন শান্তির বার্তা হৃদয়ে ধারণ করে, তবে এই পৃথিবী একটি শান্তিময় উদ্যানে পরিণত হবে।

হে মানবজাতি! আসুন, আজ এই মোবারক দিনে আমরা হিংসা, বিদ্বেষ আর হানাহানিকে চিরতরে বিদায় জানাই। মহান আল্লাহর দরবারে তাওবা করি এবং প্রতিজ্ঞা করি—আমরা একে অপরের বিপদে পাশে দাঁড়াবো।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সর্বজনীন আদর্শের আলোয় নিজেদের জীবনকে আলোকিত করার তৌফিক দান করুন।

ওয়াহিরু দাওয়ানা আনিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

------------------------------------------------------------

মিষ্টি হাসির যন্ত্রণা (গান)

  কবি — মোহাম্মদ আমিনুল এহছান মোল্লা। রাওনাট , কাপাসিয়া , গাজীপুর। ******************************************** হৃদয়ের ফ্রেমে এঁ...